প্রিন্ট ভিউ

মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন অধ্যাদেশ, ২০২৬

( ২০২৬ সনের ০৫ নং অধ্যাদেশ )

এই অধ্যাদেশ মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০২৬ (২০২৬ সনের ৫৫ নং আইন) দ্বারা রহিত করা হইয়াছে।

প্রথম অধ্যায়

প্রারম্ভিক

সংক্ষিপ্ত শিরোনাম ও প্রবর্তন

১। (১) এই অধ্যাদেশ মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন অধ্যাদেশ, ২০২৬ নামে অভিহিত হইবে।

(২) ইহা অবিলম্বে কার্যকর হইবে।

সংজ্ঞা

২। বিষয় বা প্রসঙ্গের পরিপন্থি কোনো কিছু না থাকিলে, এই অধ্যাদেশে-

(১) “অপহরণ (abduction)” অর্থ দফা (২০) এ বর্ণিত কোনো শোষণমূলক কার্যের উদ্দেশ্যে ভয়ভীতি প্রদর্শন বা বলপ্রয়োগ করিয়া কোনো ব্যক্তিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বা বাহিরে গমন, অভিবাসন বা বহির্গমন করিতে বাধ্য করা এবং Penal Code, 1860 (Act No. XLV of 1860) এর section 362-তে Abduction অভিব্যক্তিটি যে অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে, সেই অর্থও ইহার অন্তর্ভুক্ত হইবে;

(২) “অবৈধ প্রবেশ (illegal entry)” অর্থ গন্তব্য দেশ (receiving or destination state) হিসাবে বাংলাদেশে বা অন্য কোনো রাষ্ট্রে বৈধভাবে প্রবেশের জন্য নির্ধারিত বন্দর বা স্থান ব্যতীত অন্য কোনো বন্দর বা স্থান ব্যবহার করিয়া অথবা প্রয়োজনীয় শর্তাবলি (legal requirements) প্রতিপালন না করিয়া এক বা একাধিক রাষ্ট্রের (transit state) সীমান্ত অতিক্রম করা;

(৩) “অভিবাসী (migrant)” অর্থ এইরূপ কোনো ব্যক্তি যিনি এক দেশ হইতে অন্য দেশে গমন করেন বা গমন করিবার উদ্দেশ্যে কোনো কার্যক্রম গ্রহণ করেন;

(৪) “আশ্রয় কেন্দ্র” অর্থ জেলখানা ব্যতীত এইরূপ কোনো প্রতিষ্ঠান যাহা, যে নামেই অভিহিত হউক না কেন, মানব পাচার বা অভিবাসী চোরাচালানের শিকার কিংবা মানব পাচার বা অভিবাসী চোরাচালান হইতে উদ্ধারকৃত ব্যক্তিকে গ্রহণ, আশ্রয় প্রদান এবং পুনর্বাসনকল্পে প্রতিষ্ঠিত;

(৫) “আশ্রয় দেওয়া” বা “লুকাইয়া রাখা (harbouring)” অর্থ কোনো ব্যক্তিকে তাহার দেশের অভ্যন্তরে বা বাহিরে বিক্রয় বা পাচারের উদ্দেশ্যে কিংবা কোনো অভিবাসীকে চোরাচালানের উদ্দেশ্যে লুকাইয়া রাখা, আশ্রয় দেওয়া বা অন্য কোনোভাবে সহায়তা করা এবং Penal Code, 1860 এর section 52A-তে Harbour অভিব্যক্তিটি যে অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে, সেই অর্থও ইহার অন্তর্ভুক্ত হইবে;

(৬) “ঋণ-দাসত্ব (debt-bondage)” অর্থ কোনো ব্যক্তির এইরূপ অবস্থা, যাহার কারণে উক্ত ব্যক্তি কোনো ঋণের জন্য প্রকৃতপক্ষে দায়গ্রস্ত হইলে অথবা বেআইনিভাবে তাহাকে ঋণ-দায়গ্রস্ত বলিয়া দাবি করা হইলে উক্ত ব্যক্তিকে উক্ত ঋণের জামানতস্বরূপ নিজের ব্যক্তিগত সেবা বা শ্রম প্রদান করিতে হয়, কিন্তু উক্ত সেবা বা শ্রমের মূল্য ঋণ পরিশোধ হিসাবে গণ্য হয় না, অথবা উক্ত সেবা বা শ্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য প্রদান করিতে হয়;

(৭) “জবরদস্তিমূলক শ্রম বা সেবা” অর্থ কোনো ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, অধিকার, সম্পত্তি, সুনাম বা অন্য কোনো বিষয়ে ক্ষতি সাধনের হুমকি প্রদর্শন করিয়া, তাহার ইচ্ছার বিরুদ্ধে, তাহার নিকট হইতে গৃহীত কার্য বা সেবা;

(৮) “ট্রাইব্যুনাল” অর্থ ধারা ৩৬ এর অধীন গঠিত মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল;

(৯) “দাসত্ব” অর্থ কোনো ব্যক্তির অবস্থান বা মর্যাদার (status) এইরূপ পর্যায়ে অবনমন, যাহার ফলে উক্ত ব্যক্তি অন্য কোনো ব্যক্তি কর্তৃক সম্পত্তির ন্যায় নিয়ন্ত্রিত ও ব্যবহৃত হয় এবং উক্ত ব্যক্তি কর্তৃক গৃহীত কোনো ঋণ বা সম্পাদিত কোনো চুক্তির কারণে উদ্ভূত কোনো শর্ত বা অবস্থাও (condition) ইহার অন্তর্ভুক্ত হইবে;

(১০) “নবজাতক” অর্থ অনূর্ধ্ব ৪০ (চল্লিশ) দিন বয়সের কোনো শিশু;

(১১) “পতিতাবৃত্তি” অর্থ বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে অথবা অর্থ বা সুবিধা (kind) লেনদেন করিয়া কোনো ব্যক্তিকে যৌন শোষণ;

(১২) “পতিতালয়” অর্থ পতিতাবৃত্তি পরিচালনার উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত কোনো বাড়ি, যানবাহন, স্থান বা স্থাপনা;

(১৩) “প্রতারণা (fraud)” অর্থ ঘটনা (fact) বা আইন সম্পর্কে ইচ্ছাকৃত বা দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে কোনো কথা বা আচরণ অথবা লিখিত কোনো চুক্তি বা দলিল দ্বারা অন্যকে প্রতারিত বা প্রলুব্ধ করা বা ভুল পথে পরিচালিত করা এবং প্রতারণাকারী ব্যক্তি বা অন্য কোনো ব্যক্তির অভিপ্রায়কে কেন্দ্র করিয়া সংঘটিত প্রবঞ্চনা এবং Contract Act, 1872 (Act No. IX of 1872) এর section 17 এ Fraud অভিব্যক্তিটি যে অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে, সেই অর্থও ইহার অন্তর্ভুক্ত হইবে;

(১৪) “প্রতারণামূলক ভ্রমণ দলিল বা পরিচয়পত্র (fraudulent travel or identity document)” অর্থ এইরূপ কোনো ভ্রমণ দলিল বা পরিচয়পত্র, যাহা-

(ক) কোনো রাষ্ট্রের পক্ষে প্রস্তুত বা প্রদান করিবার জন্য আইনগতভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তি বা সংস্থা ব্যতীত অন্য কোনো ব্যক্তি বা সংস্থা কর্তৃক জালিয়াতির মাধ্যমে প্রস্তুত করা হইয়াছে বা উহার কোনো গুরুত্বপূর্ণ অংশ পরিবর্তন করা হইয়াছে; বা

(খ) মিথ্যা বর্ণনা (misrepresentation) প্রদান করিয়া, জোরজবরদস্তি করিয়া, অসদুপায়ে বা অন্য কোনো বেআইনি উপায়ে সংগ্রহ করা হইয়াছে; বা

(গ) উহার বৈধ অধিকারী (rightful holder) ব্যতীত অন্য কোনো ব্যক্তি কর্তৃক ব্যবহৃত হইতেছে;

(১৫) “বলপ্রয়োগ” অর্থ কোনো ব্যক্তি কর্তৃক অপর কোনো ব্যক্তির উপর শক্তি প্রয়োগ করিয়া বা তাহাকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করিয়া বা তাহার উপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ প্রয়োগ কিংবা তাহার কোনো প্রকার ক্ষতিসাধন করিবার বা তাহাকে আটক রাখিবার হুমকি প্রদর্শন করিয়া বা তাহাকে নির্যাতনপূর্বক বেআইনি কোনো কাজ করিতে বা আইনানুগ কোনো কাজ করা হইতে বিরত থাকিতে বাধ্য করা;

(১৬) “ব্যক্তি” অর্থ স্বাভাবিক ব্যক্তিসহ (natural person) যেকোনো কোম্পানি, অংশীদারি কারবার, ফার্ম বা একাধিক ব্যক্তির সমিতি বা সংঘ, উহা নিবন্ধিত হউক বা না হউক;

(১৭) “মানব পাচারের শিকার ব্যক্তি (trafficked person)” বা “চোরাচালানের শিকার অভিবাসী (smuggled migrant)” বা “ভিকটিম” অর্থ এই অধ্যাদেশের অধীন সংঘটিত মানব পাচার বা, ক্ষেত্রমত, অভিবাসী চোরাচালানের শিকার কোনো ব্যক্তি বা অভিবাসী, এবং উক্ত ব্যক্তি বা অভিবাসীর আইনগত অভিভাবক বা উত্তরাধিকারীও ইহার অন্তর্ভুক্ত হইবে;

(১৮) “মারাত্মক জখম” অর্থ Penal Code, 1860 এর section 320-তে সংজ্ঞায়িত grievous hurt;

(১৯) “শিশু” অর্থ ১৮ (আঠারো) বৎসর বয়সের নিম্নের কোনো ব্যক্তি;

(২০) “শোষণ (exploitation)” অর্থ কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে তাহার সম্মতিক্রমে বা বিনা সম্মতিতে কৃত অন্যান্য কার্যের মধ্যে নিম্নবর্ণিত কার্যসমূহ, যথা:-

(ক) পতিতাবৃত্তি বা যৌন শোষণ (sexual exploitation) এর মাধ্যমে কোনো ব্যক্তিকে শোষণ;

(খ) কোনো ব্যক্তিকে পতিতাবৃত্তি অথবা পর্নোগ্রাফি উৎপাদন বা বিতরণে নিয়োজিত করিয়া মুনাফা ভোগ;

(গ) জবরদস্তিমূলক শ্রম বা সেবা আদায়;

(ঘ) ঋণ-দাসত্ব, দাসত্ব, দাসত্বরূপ কর্মকাণ্ড, বা গৃহস্থালিতে সার্ভিটিউড (domestic servitude);

(ঙ) প্রতারণামূলক বিবাহের মাধ্যমে শোষণ;

(চ) কোনো ব্যক্তিকে জোরপূর্বক বিনোদন ব্যবসায় ব্যবহার;

(ছ) কোনো ব্যক্তিকে ভিক্ষাবৃত্তিতে বাধ্যকরণ;

(জ) ব্যবসা করিবার উদ্দেশ্যে কোনো ব্যক্তির অঙ্গ-প্রত্যঙ্গহানী বা তাহাকে বিকলাঙ্গকরণ (removal of organs for trading);

(ঝ) কোনো ব্যক্তিকে অপরাধমূলক কার্য, যেমন-মাদক পরিবহণ ও বিতরণ, প্রতারণা, ইত্যাদি করিতে বাধ্যকরণ;

(ঞ) কোনো ব্যক্তিকে আটক রাখিয়া মুক্তিপণ দাবি বা উহা আদায়; এবং

(ট) অসৎ উদ্দেশ্যে দত্তক গ্রহণের মাধ্যমে শোষণ;

(২১) “সক্রিয় অনুসন্ধান (proactive inquiry)” অর্থে ট্রাইব্যুনালে দায়েরকৃত কোনো অভিযোগে অভিযোগকারীর দাবি অনুসারে অভিযুক্ত ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট কি না তদ্‌সম্পর্কে প্রাথমিক সত্যতা যাচাই করিবার উদ্দেশ্যে ট্রাইব্যুনালের আদেশক্রমে কোনো ব্যক্তি, আইন প্রয়োগকারী বা তদন্ত সংস্থা, নির্বাহী কর্তৃপক্ষ, সরকারি সংস্থা বা সরকার কর্তৃক অনুমোদিত ও নিবন্ধিত বা অনিবন্ধিত কোনো বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) অথবা বৈদেশিক অনুদান (স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম) রেগুলেশন আইন, ২০১৬ (২০১৬ সনের ৪৩ নং আইন) অনুযায়ী নিবন্ধিত কোনো বেসরকারি সংস্থার নিকট হইতে অথবা উপযুক্ত ও নির্ভরযোগ্য অন্য কোনো উৎস হইতে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহকরণ অন্তর্ভুক্ত হইবে;

(২২) “সরকারি কর্মচারী (public servant/official)” অর্থ Penal Code, 1860 এর section 21 এ বর্ণিত কোনো জনসেবক বা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদে উল্লিখিত সংজ্ঞানুসারে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত কোনো ব্যক্তি, যিনি এই অধ্যাদেশের অধীন কোনো দায়িত্ব পালন করেন;

(২৩) “সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র” অর্থ জাতীয়তা এবং অবস্থান নির্বিশেষে ২ (দুই) বা ততোধিক ব্যক্তির কাঠামোবদ্ধ কোনো সংগঠন, যাহা নির্দিষ্টকাল পর্যন্ত সক্রিয় এবং যাহার সদস্যগণ এই অধ্যাদেশের অধীন কোনো অপরাধ সংঘটনের উদ্দেশ্যে একত্রে কাজ করে;

(২৪) “সার্ভিটিউড (servitude)” অর্থ কাজ বা সেবা প্রদান করিবার বাধ্যবাধকতা অথবা জবরদস্তিমূলক কাজ বা সেবার শর্তাবলি, যাহা হইতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নিষ্কৃতি পান না বা যাহা তিনি পরিবর্তন করিতে পারেন না।

অধ্যাদেশের প্রাধান্য

৩। (১) উপ-ধারা (৩) এর বিধান সাপেক্ষে, আপাতত বলবৎ অন্য কোনো আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, এই অধ্যাদেশের বিধানাবলি প্রাধান্য পাইবে।

(২) উপ-ধারা (১) এর বিধান সত্ত্বেও, বিদ্যমান অন্য কোনো আইনে ভিকটিম এবং সাক্ষীর সুরক্ষা বিষয়ক শ্রেয় মানদণ্ডের (standard of excellence) বিধান থাকিলে উক্ত বিধান, এই অধ্যাদেশের সহিত অসামঞ্জস্যপূর্ণ না হওয়া সাপেক্ষে, প্রযোজ্য হইবে।

(৩) উপ-ধারা (১) এর বিধান সত্ত্বেও, এই অধ্যাদেশ অভিবাসন ও বহিরাগমন বিষয়ক অন্যান্য বিদ্যমান আইনের পরিপূরক হইবে এবং উহাদের ব্যত্যয়ে ব্যবহৃত হইবে না।

অধ্যাদেশের অতিরাষ্ট্রিক (extra territorial) প্রয়োগ

৪। (১) বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সীমানার বাহিরে অথবা বাংলাদেশের কোনো জাহাজ বা বিমানে কোনো ব্যক্তি বাংলাদেশি কোনো নাগরিকের বিরুদ্ধে এই অধ্যাদেশের অধীন কোনো অপরাধ সংঘটন করিলে উক্ত ব্যক্তি ও অপরাধের ক্ষেত্রে এই অধ্যাদেশের বিধানাবলি প্রযোজ্য হইবে।

(২) যদি কোনো ব্যক্তি বাংলাদেশের বাহির হইতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অথবা বাংলাদেশের অভ্যন্তর হইতে বাংলাদেশের বাহিরে এই অধ্যাদেশের অধীন কোনো অপরাধ সংঘটন করেন, তাহা হইলে উক্ত অপরাধ ও উহা সংঘটনের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া বাংলাদেশে সংঘটিত হইয়াছে বলিয়া গণ্য হইবে এবং উক্ত ব্যক্তি ও অপরাধের ক্ষেত্রে এই অধ্যাদেশের বিধানাবলি প্রযোজ্য হইবে।


Copyright © 2019, Legislative and Parliamentary Affairs Division
Ministry of Law, Justice and Parliamentary Affairs